০৬-০৩-১৯ : প্রাতঃমুরলী ওঁম্ শান্তি! "বাপদাদা" মধুবন


"মিষ্টি বাচ্চারা - জ্ঞান সাগর বাবা থালা ভরে-ভরে রত্নরাজি দেন তোমাদের। যত খুশী নিজেদের থলিতে তা ভরে নাও আর সব চিন্তা থেকে রেহাই পাও"

প্রশ্ন:-

জ্ঞান-মার্গের কোন্ বিষয়টিকে ভক্তি-মার্গও পছন্দ করে ?

উত্তর:-

স্বচ্ছতা ! বাচ্চারা, জ্ঞান-মার্গে তোমরা স্বচ্ছ থাকো। তোমাদের ময়লা কাপড়কে স্বচ্ছ বানাবার জন্যই বাবা এসেছেন। আপন ঘরে ফেরার লক্ষ্যে আত্মা যখন স্বচ্ছ অর্থাৎ পবিত্র (হাল্কা) হয়, তখনই সে 'উড়ুক্কু-ডানা' পায় উড়ার জন্য। ভক্তি-মার্গও স্বচ্ছতাকে খুবই পছন্দ করে। স্বচ্ছ হবার জন্য তারা গঙ্গায় স্নানও করে। কিন্তু জলের দ্বারা তো আর আত্মা স্বচ্ছ হতে পারে না।

ওম শান্তি!

মিষ্টি-মিষ্টি বাচ্চারা, স্মরণের যোগে থাকতে কখনওই যেন ভুলে যেও না। প্রত্যুষে যখন তা অভ্যাস করবে, তখন যেন কোনও কথা বা বাণী না চলে। নির্বাণধামে পৌঁছবার এটা একটা যুক্তি। পবিত্র হতে না পারলে যে উড়তেই পারবে না- ফলে আপন ঘরে পৌঁছতেই পারবে না তোমরা। একথা তো তোমাদের জানা আছে, সত্যযুগের শুরুতে অনেক সংখ্যক আত্মাই উড়ে পৌঁছায় সেখানে। আর এখানে এখন কত কোটি কোটি আত্মার সমাবেশ। সত্যযুগে মাত্র কয়েক লক্ষ যাবে সেখানে (স্বর্গ-ধামে)। বাকীরা সবাই তখন উড়ে যাবে আপন ঘরে। তাদের এই ওড়ার ডানা অবশ্যই কেউ এসে দেবেন। স্মরণের এই যাত্রার দ্বারাই আত্মা পবিত্র হয়। একমাত্র এই পদ্ধতি ছাড়া, পবিত্র হওয়ার আর অন্য কোনও উপায়ও নেই। পতিত-পাবনও কেবল এই একজন বাবা'ই। এঁনাকেই কেউ 'ঈশ্বর' বলে, কেউ বা বলে 'পরমাত্মা' আবার 'ভগবান'ও বলে কেউ কেউ। যদিও এত বিভিন্ন নাম সেই একজনেরই। এঁনারা কেউ ভিন্ন ভিন্ন নয়। সব আত্মাদেরই পিতা তো এই একজনই। লৌকিকে বাবা হয় সবার নিজের নিজের, কিন্তু পারলৌকিক বাবা সবারই এই একজনই। সেই এক ও একমাত্র বাবা যখন আসেন, সবারই সুখের ব্যবস্থা করে তবেই তিনি ঘরে ফিরে যান। সেই সুখের দিনের পর তো আর ওঁনাকে স্মরণ করার প্রয়োজনই পড়ে না। যেহেতু তখন তা অতীত হয়ে যায়। এবার বাবা সেই অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের রহস্যগুলি ব্যাখ্যা করে বোঝাচ্ছেন। যেমন, বৃক্ষের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের বিষয়টা খুবই সহজ। বাচ্চারা জানো, কিভাবে বীজ থেকে বৃক্ষ হয়, তারপর তা বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় তার অন্তিম-দশাও আসে। একেই বলা আদি, মধ্য, অন্ত। তেমনি কল্পবৃক্ষও নানা ধর্মের ডাল-পালার বিস্তারে অদ্ভুত এক বৃক্ষ। কত বৈচিত্র্যে ভরা এই বৃক্ষ। এক একটি বৈচিত্র্য তাদের নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যের। যদি ফুলের ব্যাপারটাই ধরো, তোমরা দেখবে যেমন যেমন বৃক্ষ, তেমন তেমন তার ফুলের বৈচিত্র। যদিও ফুলেদের বৈশিষ্ট্য সবই একই প্রকারের। মনুষ্য সৃষ্টির কল্পবৃক্ষের ঝাড় নানা বৈচিত্র্যে ভরা। যেখানে ঝাড়ের প্রত্যেকটি ডাল-পালার শোভাই ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের। *এই ঝাড়-বৃক্ষও অনেক প্রকারের শোভাবর্ধন করে। উদাহরণে বাবা জানাচ্ছেন - যেমন শ্যাম-সুন্দর (কুৎসিত ও সৌম্য), যা ঘটে কেবল দেবী-দেবতাদের ক্ষেত্রে। তেমনি তোমরাও এই কুৎসিত অবয়ব-এর পরিবর্তন ঘটিয়ে সৌম্য অবয়ব পেতে চলেছ। এমন শ্যাম-সুন্দর অবস্থা অন্য কোনও ধর্মে ঘটে না। তাদের বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ্য করো। জাপানীদের, ইউরোপীয়দের, চীনাদের অবয়বের বৈচিত্রগুলি লক্ষ্য করো, তেমন বদল হয় না। অবয়বের বদল যা হয় তা কেবল এই ভারত ভূ-খণ্ডেই। আর তাই সেই শ্যাম-সুন্দরেরই এত প্রশস্তি গাওয়া হয়*। এমনটি আর কোনও ধর্মেই হয় না। এমনই বিচিত্রে ভরা মনুষ্য সৃষ্টির ঝাড়-বৃক্ষ। যেখানে বিভিন্ন ধর্মের সমাবেশ। তারা একে-একে তাদের সময় অনুসারে এখানে কিভাবে আসতে থাকে, তা তোমাদেরকে জানা আছে। জগতের লোকেরা এসব কিছু বুঝতেই পারবে না।



কল্পের আয়ু ৫-হাজার বছর। তাকে বৃক্ষই বলো বা জগৎ বলো, যার অর্ধেক হল ভক্তি-মার্গের অর্থাৎ যাকে রাবণ-রাজ্য বলা হয়। ৫-বিকারের সাহায্যে চলে যে রাজ্য। ফলে লোকেরা কাম-চিতায় বসে বসে পতিত ও কুৎসিত হয়ে যায়। রাবণ সম্প্রদায়ের লোকেদের এবং দৈবী সম্প্রদায়ের চাল-চলনে রাত-দিনের তফাৎ। তাই তো মনুষ্যরা দেব-দেবীদের এত মহিমা ও গুণ-কীর্তন করে আর নিজেদেরকে পাপী বলে অভিহিত করে। বাচ্চারাও তো অনেক ভক্তি করেছো। পুনর্জন্ম নিতে নিতে ভক্তি-মার্গে ভক্তিও করেছো তোমরা। এই ভক্তি-মার্গ শুরু হয় অব্যভিচারী ভক্তি দিয়ে। অব্যভিচারী ভক্তি দিয়ে শুরু হলেও, ক্রমে সেই ভক্তি ব্যভিচারীতে পরিণত হয়। অন্তিম দিকে তা সম্পূর্ণ রূপে ব্যভিচারী হয়ে ওঠে। এমন সময়ে বাবা এসে তোমাদেরকে অব্যভিচারী হওয়ার জ্ঞান শোনান। যে জ্ঞানের দ্বারা মনুষ্যের সদগতি হয়। ভক্তরা যতদিন না তা জানতে পারে-ততদিন তাদের ভক্তির দাম্ভিকতা থাকে। তারা তো এটাও জানে না যে, জ্ঞানের সাগর পরমপিতা পরমাত্মা এক ও একমাত্র একজনই। ভক্তি-মার্গে বেদ-শাস্ত্রের শ্লোকগুলি মনে রেখে সেগুলিই শোনানো হয় ভক্তদের৷ এভাবেই ভক্তি-মার্গের বিস্তার ঘটে। এটাই ভক্তি-মার্গের শোভা। তাই বাবা বলেন- এসব শোভা আসলে মৃগতৃষ্ণার শোভা। যা মরুভূমির বালুকারাশিতে দূর থেকে রূপোর মতন চমক অর্থাৎ জল মনে হয়। হরিণের তৃষ্ণা লাগলে জল ভেবে ঐ মরীচিকা বালুকারশির পানে ছুটতে-ছুটতে সেই ফাঁদে আটকে পড়ে। ভক্তি-মার্গে এমন ভাবেই লোকেরা ভক্তির ফাঁদে পড়ে। যেখান থেকে বেরোনোও খুব মুস্কিল। যদিও এখানে তাদের অনেক প্রকার বিঘ্ন আসে, তাই বাবা এসে তাদেরকে পবিত্র বানায়। যেমন দ্রৌপদী নিজের রক্ষার জন্য কতই না আকুতি জানিয়েছিল। বর্তমানের এই দুনিয়া তো দ্রৌপদী আর দুর্যোধনে ভরা। কিন্তু তোমরা বি.কে.-রা অবশ্যই তাদের বলবে - তোমরাই সেই পার্বতী, যারা মুরলীরূপী এই অমরকথা শোনো। বাবা স্বয়ং সেই অমরকথা শুনিয়ে, বি.কে.-দেরকে অমরলোকের উপযুক্ত করে গড়ে তুলছেন। এই দুনিয়াটা তো মৃত্যুলোক। অকালেই মৃত্যু ঘটে এখানে। বসে-বসেই হার্টফেল হয়ে যায়। তাই হাসপাতালে গিয়েও লোকেদের এই জ্ঞান শোনাতে পারো। তাদের কত কম আয়ু, কত রোগ ভোগ করতে হয়-কিন্তু সেখানে রোগের নামগন্ধ পর্যন্ত নেই।



ভগবানুবাচ- নিজেকে আত্মা ভেবে, এই বাবাকে স্মরণ করো। অন্যদের প্রতি মমতা (আকর্ষণ) মিটিয়ে দিতে পারলেই বিকর্মগুলি বিনাশ হতে থাকবে। রোগ-ভোগ হবে না কখনও, অকালে মৃত্যু হবে না, আয়ুও অনেক বেড়ে যাবে। দেবতাদের আয়ু কত বেশী। অনেক আয়ুর লোকেরা এখন আর কোথায়? তারাই পুনঃ-পুনঃ জন্ম নিতে নিতে তাদের আয়ু এখন এত কম। বিশ্ব-রঙ্গমঞ্চের এই খেলাটাই যে সুখ আর দুঃখের। যা লোকেরা জানেই না- কত প্রকারের মেলা ও খেলার সমাবেশ এখানে। যেমন, কুম্ভ-মেলায় কত লোক একত্রিত হয় স্নানের উদ্দেশ্যে। যদিও তাতে লাভের লাভ কিছুই হয় না। লোকেরা তো রোজই স্নান করে, সেই জল তো সাগর থেকেই যায় সর্বত্র। তবুও তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো কুয়োর জল। নদীর জলে কত প্রকারের নোংরাও তো থাকে। কুয়োর জল ওঠে প্রাকৃতিক ভাবে- যা শুদ্ধ। তাতেই বরং স্নান করাটা সবচেয়ে ভালো। আগে তো এই ব্যবস্থাই চালু ছিল। আজকাল যা নদীতে স্নানের প্রচলন হয়েছে। ভক্তি-মার্গেও স্বচ্ছতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখন তারা পরমাত্মাকে ডাকে, তিনি এসে যেন সবাইকে স্বচ্ছ বানান। গুরু নানকও পরমাত্মার এই মহিমাকে এভাবে জানিয়েছেন- (★ টীকা ⤵-) "মুত পলীতী কাপড় ধোয়ে..."- বাবা এসে যেন বাচ্চাদেরকে অর্থাৎ আত্মাদের স্বচ্ছ বানান। যদিও তারা আত্মাকে নির্লেপ (যাতে কোনও দাগ লাগে না) ভাবে। বাবা বলছেন- এই দুনিয়াটাই হল রাবণের রাজ্য। যা সৃষ্টির একেবারেই অধোগতির সময় এটা। একথারও প্রচলন তো আছে- আমার চড়তি কলা হলে সমগ্র জগতও তার সুফল পাবে ("চড়তী কলা তেরে ভানে সর্ব কা ভালা") (★★টীকা ⤵)।" অর্থাৎ বাবার দ্বারাই সবারই সদগতি হয়। তারাও বলে- বাবা, তোমার দ্বারাই যে সবার মঙ্গল হয়। অর্থাৎ উন্নতির সোপানে, সেখানে সবারই কুশল-মঙ্গল। সবাই খুব শান্তিতেই থাকে। সমগ্র বিশ্বে তখন কেবল একটিই রাজ্য। অন্যেরা তখন থাকে শান্তিধামে।



লোকেরা এখন কতই না মাথা ঘামাচ্ছে, কিভাবে বিশ্বে শান্তি স্থাপন করা যায়। তাদের কাছে জানতে চাও- পূর্বে বিশ্বে কি কখনও শান্তি ছিল, যা এখন তোমরা চাইছ ? তারা তো আবার এমনও বলে- কলিযুগের আয়ু এখনও ৪০-হাজার বছর অবশিষ্ট আছে। সত্যি, লোকেরা প্রকৃত জ্ঞানের অভাবে কত ঘোর-অন্ধকারে রয়েছে। কোথায় সম্পূর্ণ কল্পের মোট আয়ু ৫-হাজার বছর, সেখানে তারা বলে- কলিযুগের আয়ু এখনও অবশিষ্ট ৪০-হাজার বছর । এদের মধ্যেও আবার বহু মত রয়েছে। বাবা এসে সবাইকে সত্য তথ্য জানাচ্ছেন। কল্পে মানুষের জন্ম হয় সর্বাধিক ৮৪-বার। যদি তা লক্ষ-লক্ষ বর্ষই হতো, তবে তো মনুষ্যরা পশু-পক্ষী, কীট-পতঙ্গ -এসবও হতে পারতো। কিন্তু নিয়মানুসারে তা তো আর হবার নয়। মনুষ্যরা কেবল ৮৪-জন্মই নিতে পারে। তার হিসেব বাবা তো জানিয়েছেন। এইসব জ্ঞানগুলিকে খুব ভালভাবে বুদ্ধিতে ধারণ করতে হবে। ঋষি-মুনিরাও "নেতী-নেতী" অর্থাৎ সঠিক ভাবে তাঁকে (পরমাত্মাকে) জানি না বলে থাকে, তবে তো তারা নাস্তিকই হলো। অতএব আস্তিক কেউ না কেউ তো হবে। আস্তিক হলো দেবতারা আর নাস্তিক হলো রাবণ-রাজ্যের যারা। প্রকৃত জ্ঞানের দ্বারা বি.কে.-রাই আস্তিকে পরিণত হতে পারলেই আগামী ২১-জন্মের আশীর্বাদী-বর্সার অধিকারী হয়। এরপর আর জ্ঞানের প্রয়োজনই পড়ে না। বর্তমান সময়টা পুরুষোত্তম সঙ্গমযুগ, আর এই সময়েই তোমরা উত্তম থেকেও অতি উত্তম পুরুষ হয়ে স্বর্গ-রাজ্যের মালিক হতে পারো। যে যেমন জ্ঞানের পাঠ যতটা ধারণ করতে পারবে, সে ততই উচ্চ পদে আসীন হতে পারবে। প্রবাদও আছে-লেখা পড়া করলেই তো বিশ্বের মালিক হতে পারবে, তাছাড়া তো হেলাফেলা পদই। তবুও স্বর্গ-রাজ্য তো- অর্থাৎ সুখের রাজ্য। সেখানে দুঃখ-কষ্টের নামগন্ধও নেই। আর এই রাজ্য যে কেবলই দুঃখের। এখন যখন তোমরা আস্তিক হয়েইছো, সুখের রাজত্ব তো করবেই তোমরা। কিন্তু আবার যখন রাবণ রাজত্বে আসবে, নাস্তিক হয়ে দুঃখের মধ্যে পড়বে। ভারত যখন সর্ব-স্তরে অতি ধনী ছিল, সেই সময়কালের সোমনাথের মন্দির কি বিশাল ধন-সম্পদ, রত্নরাজিতে পরিপূর্ণ ছিল। কি সুন্দর তার গঠনশৈলী। মন্দির বানাবার জন্য যদি এত বিশাল ধন-সম্পদ খরচ করতে পারে, তবে তাদের নিজেদের কাছে নিশ্চয়ই প্রচুর ধন-সম্পদ থেকে থাকবে। কিন্তু এত অনেক ধন-সম্পদ তারা পেল কোত্থেকে? শাস্ত্রে তা লেখা আছে- সাগর থলি-থলি ভরে তা দিয়েছে। অর্থাৎ জ্ঞান-সাগর তোমাদেরকে এই জ্ঞান-রত্ন থালা ভরে ভরে দিচ্ছেন এখন। যতটা পারো নিজেদের থলিতে তা ভরে নাও। অজ্ঞানী ভক্তরা শংকরের সামনে গিয়ে ধন-সম্পদের জন্য প্রার্থনা করে, যেহেতু তারা প্রকৃত বাবাকেই যে জানে না। কিন্তু তোমরা বি.কে.-রা তা জানো- তাই বাবাও তোমাদেরকে থলি ভরে ভরে জ্ঞান-ধনরত্ন দিতে থাকেন। যে যতটা নিতে চাইবে, সে ততটাই ভরে নিতে পারবে। যে যত মনোযোগের সাথে পড়বে, সে তত উঁচু স্কলারশিপ পাবে। অর্থাৎ চাইলে 'ডাবল -রাজ মুকুট'-এর অধিকারী হতে পারো, নতুবা গরীব প্রজা বা দাস-দাসীও হতে পারো। অনেকে আবার বাবাকে ছেড়েও চলে যায় - যেমনটি আছে অবিনাশী ড্রামার চিত্রপটে। তাই বাবা এসবের জন্য কোনও দুশ্চিন্তা করেন না। উনি সবকিছু থেকেই চিন্তামুক্ত থাকেন। বাচ্চাদেরও উনি তেমন ভাবেই গড়ে তুলছেন। এ যেন দুশ্চিন্তা থেকে চিন্তামুক্ত, যার ভরসা একমাত্র সদগুরু - যিনি স্বামী অর্থাই সবারই বাবা, যিনি সবকিছুরই মালিক।



এবার বাবা বলছেন- বাচ্চারা, আমি তোমাদের বেহদের টিচার। ভক্তিমার্গে থাকাকালীন তোমরা অনেক টিচারের কাছে অনেক বিদ্যা অধ্যায়ন করেছো। কিন্তু বাবা এখন যা পড়াচ্ছেন তা সব স্কুল-কলেজের পড়াশোনা থেকে একেবারেই অন্য ধরনের। তোমাদের এই বাবা হলেন জ্ঞানের সাগর, কিন্তু ওঁনাকে 'জানী জাননহার' (যে মনের কথা জানে) বলা চলে না। অনেকেই এমন বলে থাকে- আপনি তো আমার মনের কথা সব জানেন। বাবা জানান- আমি সেসবের কিছুই জানি না। আমি তো কেবল তোমাদেরকে এই বিশেষ জ্ঞানের পাঠ পড়াবার জন্য আসি, তোমরা আত্মারা তোমাদের স্ব-আসনে বিরাজমান থাকো। আমিও আমার নিজের আসনে বিরাজমান হই। আত্মা অতি ক্ষুদ্র বিন্দু স্বরূপ - যা কেউই জানে না। এই কারণেই বাবা বলেন- আগে আত্মাকে জানো, তবেই বাবাকে জানতে পারবে। তাই বাবা শুরুতেই আত্মার বিষয়ে জ্ঞানকে ব্যাখ্যা করে তারপরে বাবার পরিচয় জানাতে বলেন। ভক্তি-মার্গে শালিগ্রাম বানিয়ে তাকে পূজো করার পর তা নষ্টও করে দেওয়ার রীতি। তাই তো বাবা বলেন- তবে তো তা শিশুদের পুতুল খেলাই হলো। যারা এই বিষয়গুলিকে খুব ভালভাবে বুঝতে পারবে, একমাত্র তারাই অন্যদের কল্যাণ করতে পারবে। কল্যাণকারী বাবার বাচ্চাদের তো কল্যাণকারী হতে হবে। কেউ কেউ আবার অন্যদেরকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেরাই সেই পাঁকে আটকে যায়। ফলে তারাও অপবিত্র হয়ে যায়। পুণ্যি করতে গিয়ে উল্টে পাপের বোঝা বাড়ায়। তাই বাবা বারবার সতর্ক করতে থাকেন। কাম-চিতায় বসতে বসতে তোমরা কালিমালিপ্ত হয়ে পড়ো। তখন আফসোস করে বলতে হবে, যে আমি এত স্বচ্ছ ছিলাম, সেই আমি আজ এত কালিমালিপ্ত হয়েছি। যে আমি কখনও দেবতার মতন এত পবিত্র ছিলাম, সেখানে আজ আমার এত অবনতি। অবশ্য এমনটা না হলে কি আর ৮৪-জন্মের চক্রে আসতে হয়। তার হিসাবও বাবা বুঝিয়ে দেন। তবে বাচ্চাদেরও অনেক পরিশ্রম করতে হয় এর জন্য। এই যে অর্ধেক কল্প ধরে বিষয় সাগরের মোহে পড়ে থেকে, তার থেকে বেরিয়ে আসাটা এত সহজ ব্যাপার (মাসীর বাড়ি যাওয়ার মতো সহজ নয়) নয় মোটেই।



কেউ যদি অল্প একটুও জ্ঞানের পাঠ পড়ে, তার বিনাশ হয় না। এই মুরলী যে সত্য নারায়ণের মতন হওয়ার জন্য, তাই নিদেনপক্ষে প্রজা তো হবেই সে। আবার কেউ হয়তো সামান্য কিছু শুনেই চলে যায়, পরে আবার আসবে, জানার আগ্রহে। (অন্তিম) সময় যতই এগোতে থাকবে, মানুষের মধ্যে বৈরাগ্যও ততই আসতে থাকবে। যেমন শ্মশানের পরিবেশে গেলে মনে বৈরাগ্যের ভাব প্রকট হয়। আবার বাইরে বেরোলেই তা দূর হয়ে যায় ধীরে ধীরে। তেমনি তোমরাও যখন কারওকে বোঝাতে থাকো, তখন তা খুব ভাল, ভাল বলে- কিন্তু বাইরে বেরিয়েই সেই ভাব উধাও হয়ে যায় ধীরে ধীরে। বেরোবার আগে জানিয়ে যায়, তাদের কাজকর্ম সেরে আবার আসবে এখানে। কিন্তু বাইরে বেরোনোর সাথে সাথেই মায়া তাদের মাথা চিবাতে থাকে ক্রমান্বয়ে, ফলে তারা আর এমুখো হয় না। তাই তো বলা হয়, কোটির মধ্যে খুব অল্পসংখ্যকই তা ধারণ করতে পারবে। তার উপরে রাজার পদের জন্য তো অনেক পরিশ্রমের পুরুষার্থ দরকার। তোমরা প্রত্যেকে নিজেই নিজের মনের কাছে জানতে চাও- বেহদের এই বাবার সাথে তোমরা কে কত সময় স্মরণের যোগে থাকো। বাবাকেই যে স্মরণ করতে ভুলে যাও তোমরা। নিজেরাই তা বলো। কিন্ত, যখন তোমরা অজ্ঞান ছিলে, তখন কি কখনও এমন বলেছো, বাবা আমাদের ভুলে গেছে? তাই বাবা বলছেন- ঝড়-ঝঞ্ঝা যা কিছুই আসুক না কেন, তুমি যেন নড়বড়ে হয়ো না কোনওমতেই। ঝড়-তুফান তো আসবেই, কিন্তু কর্ম-ইন্দ্রিয় দ্বারা এমন কোনও ভুল বা অন্যায় কর্ম যেন করে ফেলো না তখন। কেউ কেউ বলো- বাবা মায়া তার জাদুর ছড়িতে বশ করে নেয় যে। তখন বাবা বলেন- মিষ্টি-মিষ্টি বাচ্চারা, স্মরণের যোগে থাকতে পারলেই তো সেই কালিমার জং ভষ্ম হয়ে বেরিয়ে যাবে। এই কালিমার জং-এর প্রলেপ পড়ে তো আত্মাতেই। তা ভষ্ম হয় যোগ-অগ্নিতে। বাবা বিন্দু স্বরূপ। একমাত্র এই বাবাকে স্মরণ করে জং-কে বের করা ছাড়া আর কোনও উপায়ও যে নেই। *আচ্ছা!*



মিষ্টি-মিষ্টি হারানিধি বাচ্চাদের প্রতি মাতা-পিতা বাপদাদার স্নেহ-সুমন স্মরণ ও ভালবাসা আর সুপ্রভাত। ঈশ্বরীয় পিতা ওঁনার ঈশ্বরীয় সন্তানদের জানাচ্ছেন নমস্কার।

ধারণার জন্যে মুখ্য সার:-

১. আমরা কল্যাণকারী বাবার বাচ্চা, অতএব নিজের এবং সবারই কল্যাণ করতে হবে। এমন কোনও কর্ম যাতে না হয় আমাদের দ্বারা যার ফলে আমাদের অর্জিত পুণ্যও শেষ হয়ে যায়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

২. জ্ঞানের এই পাঠ মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করে জ্ঞান-রত্নে নিজের ঝুলি ভরতে হবে। স্কলারশিপ নেওয়ার লক্ষ্যে পুরুষার্থ করতে হবে। বাবার মতন দুঃশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে, নিশ্চিন্ত হতে হবে।

বরদান:-

ব্রাহ্মণ জন্মের বিশেষত্বকে স্বাভাবিক স্বভাব বানিয়ে নিয়ে সহজ পুরুষার্থী ভব

ব্রাহ্মণ জন্ম হল বিশেষ জন্ম। তেমনি ব্রাহ্মণ ধর্ম আর ব্রাহ্মণ কর্মও বিশেষ অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ট। তাই ব্রাহ্মণ কর্মে ফলো (অনুসরণ) সাকার ব্রহ্মা বাবাকে করা হয়। ব্রাহ্মণের স্বভাব হল বিশেষ স্বভাব। সাধারণ বা মায়াবী স্বভাব ব্রাহ্মণের স্বভাব নয়। কেবলমাত্র এটুকুতেই স্মৃতি স্বরূপে রাখতে হবে যে, আমি বিশেষ আত্মা। এই স্বভাব যখন স্বভাবিক স্বভাবে পরিণত হয়ে যাবে, তখনই বাবার সমান হওয়ার সহজ অনুভব হবে। স্মৃতি স্বরূপ অর্থাৎ সমর্থী স্বরূপ হয়ে যাবে- এটাই হল সহজ পুরুষার্থ।

স্লোগান:-

যে চতুর্দিকে পবিত্রতা আর শান্তির লাইটের প্রকাশ ছড়ায় সে-ই হল লাইট-হাউস।